Home / অন্যান্য / ইভটিজিংয়ের জন্য দায়ী কি শুধুই যুবসমাজ?

ইভটিজিংয়ের জন্য দায়ী কি শুধুই যুবসমাজ?

বছর তিন-চারেক আগেও দেশের মিডিয়ার মূল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ইভটিজিং। হয়তো এর আগে এ শব্দটির সাথে দেশের বেশির ভাগ মানুষই পরিচিত ছিল না। প্রায় সব মিডিয়াই ইভটিজিংয়ের মূলে যুবসমাজের একাংশের দিকেই আঙুল তুলত। দেশে এক সময় ফেনসিডিলের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। তারপর পর্যায়ক্রমে ইয়াবাসহ নানাবিধ মাদকদ্রব্য মুহূর্তেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তখনো তীর ছোড়া হয় ওই যুবসমাজের দিকেই।
আমি বলছি না আমাদের যুবসমাজ ধোয়া তুলসীপাতা। কোনো ১৯ বছরের যুবতী ৯০ বছরের বৃদ্ধের ইভটিজিংয়ের শিকার হবে না, এটাই স্বাভাবিক। যদি হয়েও থাকে, সেটা কোটিতে একটি কি দু’টি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ ইভটিজিংয়ের পেছনের মূল হোতা কে বা কারা? কারা আমাদের সমাজব্যবস্থা বা যুবসমাজকে নষ্টের পথে ইন্ধন জোগাচ্ছে? এ প্রশ্নের সদুত্তর অনেকেরই জানা থাকলে প্রায় কেহই মুখ খুলছে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দুইজন নারী হোস্টের পোশাক বা গেটআপ দেখে বেশ হতবাক হয়েছি, যা অনেক দেশের ওয়েস্টার্ন নারীদের পরিধেয়কেও হার মানায়। বিষয়টি শুধু দৃষ্টিকটুই নয়, অনেকের কাছেই বেশ হাস্যকর, তামাশা ও শরমের ব্যাপার হয়েও দাঁড়িয়েছে। মাঝে মধ্যে মাঠে অবস্থানরত হোস্টকে এমনভাবে ক্যামেরার সামনে উপস্থাপন করা হয়, ক্ষণিকের জন্য হলেও মনে হয়েছে তার শরীরে আদৌ কোনো কাপড় আছে কি না। প্রাণের খেলা ক্রিকেটই সম্ভবত হাতেগোনা দু-একটি বিষয়ের মধ্যে একটি, যেটি দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও উৎসাহের সাথে সপরিবারে দেখে। হয়তো প্রিয় এ খেলা ক্রিকেটও শিগগিরই সবাইকে আলাদা রুমে বসে দেখতে হবে, যা নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত। আমি আমাদের দেশের রাস্তাঘাটে বিভিন্ন সময় অনেক ওয়েস্টার্ন মেয়ে দেখেছি। তারাও আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক চলাফেরা ও পোশাকের প্রতি মনোযোগী ছিল। অনেককে আবার সালোয়ার-কামিজ পরিহিত অবস্থায়ও দেখেছি।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে- প্রায় দুই যুগ অস্ট্রেলিয়ার মতো এক আধুনিক দেশে থেকেও যেখানে বিষয়টি আমার চোখে পড়ল, প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশের হাজার হাজার মিডিয়ার দৃষ্টিগোচর হলো না। আমি নিজের প্রসঙ্গে একটি কথা বলতে চাই, আমি কোনো ধর্মান্ধ নই বা তাদের হিজাব বা বোরকা পরে আসতে বলছি না। আমাদের ধর্ম যেমন এ ধরনের বিকৃত রুচিবোধকে স্বীকৃতি দেয় না, তেমনি আমাদের কৃষ্টি-কালচারের মধ্যেও এগুলো স্থান পায় না। দুনিয়াব্যাপী আমাদের পোশাক এবং সংস্কৃতির এক বিশেষ ঐতিহ্য ও সম্মান রয়েছে। কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, দুনিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। তাই সব দিক দিয়েই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি বলব, একটি দেশের সমাজব্যবস্থাকে বিকিয়ে দিয়ে বা ধ্বংস করে কখনো দেশকে এগিয়ে নেয়া যায় না। দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থেকে পোশাক-আশাকে আধুনিক হয়ে দেশকে ওয়েস্টার্ন দেশে পরিণত করা সম্ভব নয়।
ব্যবহার যেমন একজন মানুষের বংশের পরিচয় বহন করে, ঠিক তেমনি রুচিশীল পোশাকে তার ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আমি যখন ঘরে থাকি তখন কোন পোশাকে আছি, কী করছি না করছি, আমাকে দেখতে ভালো লাগছে না কুৎসিত লাগছে ইত্যাদি ব্যাপারে কিন্তু আমার তেমন মাথাব্যথা থাকে না। কারণ আমার ওই মুহূর্তের অবস্থা কেউ দেখছে না। কিন্তু যখনই আমি বাইরে যাবো বা জনসমক্ষে হাজির হবো, প্রতিটি বিষয়ই কিন্তু বেশ প্রাকৃতিকভাবেই আমাকে আয়নার দিকে ধাবিত করবে। আমি ক্রিম বা পারফিউম লাগিয়েছি কি না? শেভ করেছি কি না? এ শার্টটি ভালো লাগবে কি না ইত্যাদি। এ প্রশ্নগুলো আমি নিজেকে করছি, কিন্তু নিজের জন্য নয়, বরং অন্যদের জন্য যাদের সান্নিধ্য আমি শিগগিরই পেতে যাচ্ছি। সবাই চায় নিজেকে অন্যের কাছে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে, আর এটা বোধকরি যেকোনো সচেতন মানুষের জন্যই এক স্বাভাবিক ব্যাপার; যা আমাদের অনেকে ইতোমধ্যেই ভুলতে বসেছি।
আমি যখন দেশে থাকতামÑ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা অন্য যেকোনো ধর্মাবলম্বী মেয়েদের মধ্যেও এ অপসংস্কৃতি দেখিনি। মিডিয়ার সামনে দূরের কথা, কোনো ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও এ ধরনের আপত্তিকর গেটআপে দেখিনি। আমাদের দেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। উন্নত দেশগুলোর ধারেকাছে যেতে আমাদের বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। অনেক বাংলাদেশীর মতে, দেশ নিয়ে অহঙ্কার করার মতো আমাদের তেমন কিছুই নেই। আমি বরাবরই তাদের মতের বিরুদ্ধাচরণ করেছি। আসলে গর্ব করার মতো আমাদের অনেক কিছুই ছিল বা এখনো আছে। তন্মধ্যে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের আতিথেয়তা ও সমাজ-সংস্কৃতিকে সর্বদাই দুনিয়ার এক নম্বর আসীনে বসিয়েছি, যে আসীনে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও এখনো বসতে পারেনি। অনেকে যুক্তিতর্কে পরাস্ত হয়ে আমার সাথে হাসিমুখেই সহমত পোষণ করতে বাধ্য হয়েছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমরা দেশে-বিদেশে যে যেখানেই আছি, আমাদের উচিত সমাজের উৎকৃষ্ট জিনিসগুলো মনেপ্রাণে ধারণ ও লালন করা, বিশ্বদরবারে তুলে ধরা ও দেশের সামগ্রিক শিক্ষা বিস্তারে ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করতে উন্নত দেশের ভালো জিনিসগুলোকে সাদরে গ্রহণ করা।
সম্প্রতি কিছু কিছু বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেশের কিছু সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থাপনায় ভারতীয় আপত্তিকর নৃত্যের ঝলকানি দেখেও বেশ আহত হয়েছি। একই সাথে আশ্চর্য হই দেশের এক শ্রেণীর মানুষের ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের প্রতি আসক্তি দেখে। এ বিষয়গুলোও আমাদের সংস্কৃতি ও যুবসমাজকে অপদস্থ করতে যথেষ্ট। হয়তো এগুলোই একদিন দাঁতব্রাশ করার মতো এক স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের দেশের মিডিয়ার সুনাম-বদনাম দুটোই আছে। মিডিয়াকে দূষিত করতে ৯৯টি সুনামের বিপরীতে একটি দুর্নামই যথেষ্ট। তাই মিডিয়াকে অত্যন্ত সচেতনতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। একটি শিশু যখন শিশু শ্রেণীর একটি বইয়ে ছড়া পাঠ করে, সেটাও কিন্তু সম্ভব হয় ওই মিডিয়ার কল্যাণেই। কাজেই এ মিডিয়া যেকোনো দেশের শক্তিশালী অস্ত্র। আশা করছি, আমার লেখার বিষয়বস্তু দেশের সব অনলাইন, টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়া, বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়সহ সব শ্রেণীর অভিভাবক ও যুবসমাজের শুভদৃষ্টি আকর্ষণ করবে। সবারই মা-বোন রয়েছে, এ বিষয়টিও সবার মাথায় রেখে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সঠিক কাজটি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আজকের যুবসমাজের রুচিবোধের ওপর।

Loading...

Check Also

জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি লাভের উপায়

হজরত ওয়াহাব রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, যে ব্যক্তি জাদু-টোনার শিকার হয়, তাঁকে জাদুর প্রভাব থেকে মুক্ত …

আংকেল আমাকে স্ত্রীর মতো ব্যবহার করে…এখন!

আমার প্রেমিক ছিলো, ৫ বছরের সম্পর্ক। এরপর সে ইউ এস এ চলে গিয়ে আর যোগাযোগ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *